গ্রীক শব্দ “bio” (যার অর্থ Life বা জীবন) ও “metric” (যার অর্থ পরিমাপ করা) থেকে উৎপত্তি হয়েছে বায়োমেট্রিক্স (Biometrics)। বায়োমেট্রিক্স হলো বায়োলজিক্যাল ডেটা মাপা এবং বিশ্লেষণ করার প্রযুক্তি। অর্থাৎ বায়োমেট্রিক্স হলো এমন একটি প্রযুক্তি যেখানে কোন ব্যক্তির শারীরবৃত্তীয় অথবা আচরণগত বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে চিহ্নিত বা সনাক্ত করা হয়।
বায়োমেট্রিক্স এর প্রকারভেদ (Classification of Biometrics)
দেহের গঠন ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতি বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। যেমন-
ক. দেহের গঠন ও শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যর বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতিঃ
১। মুখ (Face): মুখ বা
চেহারার বৈশিষ্ট্য (Facial
characteristics) বিশ্লেষণ করা।
২।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট (Fingerprint):
প্রত্যেকের আলাদা একক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হাতের ছাপ বিশ্লেষণ করা।
৩। হ্যান্ড
জিওমেটরি (Hand
Geometry): হাতের গঠন (Shape) এবং আঙ্গুলের দৈর্ঘ্যরে মাপ বিশ্লেষণ
করা।
৪। আইরিস (Iris): চোখের মণির
চারিপার্শ্বে বেষ্টিত রঙিন বলয় (Colored ring) বিশ্লেষণ করা।
৫। রেটিনা (Retina): চোখের
পেছনের অক্ষিপটের (রেটিনার) মাপ
বিশ্লেষণ করা।
৬। শিরা (Vein): হাত এবং
কব্জির শিরার প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা।
৭। ডিএনএ (DNA): কোষের মধ্যে
অবস্থিত ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ডিএনএ প্রোফাইলিং তৈরি করা।
খ. আচরণগত বৈশিষ্ট্যের
বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতিঃ
১। কন্ঠস্বর (Voice): প্রত্যেকের কণ্ঠের ধ্বনির বৈশিষ্ট্য, সুরের
উচ্চতা, সুরের
মূর্ছনা, স্পন্দনের
দ্রুততা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা।
২। সিগনেচার (Signature): হাতের দস্তখত বিশ্লেষণ করা।
৩। টাইপিং কি স্ট্রোক (Typing Keystroke): নির্দিষ্ট
কোনো পাসওয়ার্ড যা টাইপ করে এন্ট্রি করা হয় এবং বিশ্লেষণ করা।
বায়োমেট্রিক্স এর ব্যবহার (Application of Bio metrics)
বর্তমানে
নিরাপত্তার কাজে বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ প্রযুক্তি
সাধারণত দু’ধরনের
কাজে ব্যবহৃত হয়। যথা-
১। কোনো
ব্যক্তি শনাক্তকরণ (Identification)
কাজে।
২। সত্যতা যাচাই (Verification) কাজে।
ক) ব্যক্তি শনাক্তকরণ (Identification) কাজঃ
ব্যক্তি শনাক্তকরণ কাজে প্রচলিত সনাতনী পদ্ধতিতে ভোটার আইডি, পাসপোর্ট
অথবা ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি টোকেন নির্ভর এবং ইউজার নেম, পাসওয়ার্ড
বা পিন নম্বর ইত্যাদি জ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে জালিয়াতির সুযোগ
থাকে। তাই বর্তমানে মানুষের নিজস্ব একক কোনো বৈশিষ্ট্যের আলোকে অর্থাৎ
বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতিতে শনাক্তকরণের কাজ করা হয়। এটি অনেক বেশি নিরাপদ ও
গ্রহণযোগ্য।
খ) সত্যতা যাচাই (Verification) কাজঃ এ পদ্ধতিতে কম্পিউটারে রক্ষিত বায়োলজিক্যাল ডেটার তুলনা করে ভেরিফিকেশন করা হয়।
বায়োমেট্রিক্সের সুবিধাঃ
১।
যন্ত্রনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা হওয়ায় এতে পক্ষপাতিত্ব ঘটার কোনো সুযোগ থাকে না।
ফলে এর নিখুঁত নিরাপত্তা পাওয়া সম্ভব।
২। প্রাথমিক
খরচ বেশি হলেও সার্বিকভাবে খরচ কম।
৩।
বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতির নিরাপত্তাজনিত কীগুলো ব্যক্তির শারীরবৃত্তীয় অংশ হওয়ায় তা
স্থানান্তরযোগ্য নয় এবং এ কারণে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে যে কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
৪। একে জাল বা
নকল করা প্রায় অসম্ভব।
বায়োমেট্রিক্সের অসুবিধা:
১।
শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল বিধায় এতে ব্যবহৃত শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো
অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কোনো সাময়িক বা স্থায়ী পরিবর্তন শনাক্তরণের কাজটি ধীর বা
অসফল করে তুলতে পারে।
২। ইন্সটলেশন
খরচ বেশি।
৩। এটি পরিচালনার
জন্য দক্ষ লোকের প্রয়োজন হয়।
আঙ্গুলের ছাপ (Finger print)
এটি ব্যক্তি সনাক্তকরণের জন্য সর্বাধিক পরিচিত এবং ব্যবহৃত বায়োমেট্রিক (Biometrics) পদ্ধতি। মানুষের আঙুলের ছাপ ইনপুট হিসেবে গ্রহন করার পর তা পূর্বে সংরক্ষিত আঙুলের ছাপের টেম্পলেটের সাথে ম্যাচ করে ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে সনাক্ত করার কার্যকর পদ্ধতি হলো আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গার প্রিন্ট প্রযুক্তি।
আর, যে বায়োমেট্রিক্স (Biometrics) ডিভাইসে মানুষের আঙুলের ছাপ ইনপুট হিসেবে গ্রহন করার পর তা পূর্বে সংরক্ষিত আঙুলের ছাপের টেম্পলেটের সাথে ম্যাচ করে ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে সনাক্ত করা হয় তাকে ফিঙ্গার প্রিন্ট রিডার বলে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বায়োমেট্রিক্সের সুবিধাঃ
১। সঠিকতা (অ্যাকিউরিসি) অভ্যন্ত
উচ্চমানের।
২। সবচেয়ে
সস্তা, উন্নত
ও সহজলভ্য বায়োমেট্রিক্স
(Biometrics) ডিভাইস।
৩। সহজে
ব্যবহারযোগ্য এবং এর ডেটাবেজ মেইনটেইনে অল্প মেমোরির প্রয়োজন হয়ে থাকে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বায়োমেট্রিক্সের অসুবিধাঃ
১। হাতের
আঙুলে ময়লা বা দাগ প্রভৃতি লাগার কারণে বায়োমেট্রিক্স ডিভাইসে সঠিক ফলাফল পেতে
দেরি হতে পারে বা অকৃতকার্য হতে পারে। যেমন- শ্রমিকরা যেহেতু সবসময় হাতের কাজ করে
তাই তাদের জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট বায়োমেট্রিক্স (Biometrics) সমস্যার সৃষ্টি করে।
২। বয়স বৃদ্ধি
পেলে হাতের আঙুলের ছাপ পরিবর্তিত হয় বিধায় বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই প্রযুক্তি
কার্যকর নয়।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডারের ব্যবহারঃ
১। বিভিন্ন
অফিস আদালত, শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা
প্রভৃতি স্থানে উপস্থিতি নির্ণয়ে সর্বাধিকভাবে ব্যবহৃত হয়।
২। মোবাইল, ল্যাপটপ
প্রভৃতি ডিভাইসে একসিস (প্রবেশ) এর ক্ষেত্রে
বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৩। ব্যক্তির
জাতীয় পরিচয় পত্র নিবন্ধনের ক্ষেত্রে।
৪। বর্ডার
নিয়ন্ত্রনে পাসপোর্ট যাচাইয়ের ক্ষেত্রে।
৫। আদমশুমারির
রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে।
ফেইস রিকগনিশন সিস্টেম (Facial Recognition System):
যে বায়োমেট্রিক্স (Biometrics) পদ্ধতিতে মানুষের মুখের জ্যামিতিক আকার ও গঠনকে পরীক্ষা করে উক্ত ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে সনাক্ত করা হয় তাকে ফেইস রিকগনিশন সিস্টেম বলে। এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির সরাসরি মুখের ছবিকে কম্পিউটারে সংরক্ষিত ছবির সাথে তুলনা করা হয়। এ পদ্ধতিতে দুই চোখের মধ্যবর্তী দুরত্ব, নাকের দৈর্ঘ্য ও ব্যাস, চোয়ালের কৌনিক পরিমান ইত্যাদি পরিমাপের মাধ্যমে ব্যক্তিকে সনাক্ত করা হয়।
ফেইস রিকগনিশন সিস্টেম যেভাবে কাজ করেঃ
ফেইস রিকগনিশন পদ্ধতিতে একটি সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরার সামনে মাত্র কয়েক সেকেন্ড দাঁড়ালে এটি ঐ ব্যক্তির মুখের একটি ইমেজ নিয়ে তা সংযুক্ত কম্পিউটারে প্রেরণ করে। কম্পিউটার কেবল ঐ মুখের কিছু নির্দিষ্ট বিষয় যেমন- চোখ, মুখ ও নাকের দূরত্ব, এদের অবস্থান ইত্যাদি ডেটা নিয়ে একটি নিউমেরিক কোড তৈরি করে। অতঃপর প্রাপ্ত নিউমেরিক ডেটাকে পূর্বে ঐ ব্যক্তির ফেস থেকে জেনারেট করা নিউমেরিক কোডের সাথে মিলিয়ে ব্যক্তিটিকে অদ্বিতীয়ভাবে শনাক্ত করে।
ফেইস রিকগনিশন বায়োমেটিক্সের সুবিধাঃ
১। অনধিকার প্রবেশমূলক নয়।
২। তুলনামূলক
সস্তা প্রযুক্তি।
৩। সহজে
ব্যবহারযোগ্য।
৪। সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়।
ফেইস রিকগনিশন বায়োমেট্রিক্সের অসুবিধাঃ
১। মুখে আলোর প্রতিফলন ঘটলে অনেক সময় এ সিস্টেমটি
মুখমন্ডল চিনতে পারে না।
২। চোখে
সানগ্লাস পরা, এছাড়া
টুপি, দাড়ি, লম্বা চুল, স্কার্ফ, মেকআপ
ইত্যাদি থাকলে মুখমন্ডল চিনতে অসুবিধা দেখা দেয়।
৩। অভিন্ন
যমজদের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি তেমন কার্যকর নয়।
৪। সময়ের
সাথে সাথে মানুষের মুখের বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিবর্তন হয় ফলে সনাক্ত করতে সমস্যা হয়।
ফেইস রিকগনিশনের ব্যবহারঃ
১। অধিকাংশ পার্সোনাল ডিভাইসে (যেমন: স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব
প্রভৃতি) এখন
বিল্ট ইন ফেস ক্যামেরা থাকায় এই সমস্ত ডিভাইস অ্যাক্সেস বা অথেনটিকেশনে এখন ফেইস
রিকগনিশন ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
২। স্মার্ট
অ্যাডভার্টাইজিং বয়স অনুযায়ী অ্যাড মার্কেটিং গ্রুপ নির্ধারণে ফেইস রিকগনিশন
সিস্টেম ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
৩। ডিজিটাল
ডেটার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ফেইস রিকগনিশন সিস্টেম ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
৪। কোন বিল্ডিং
বা কক্ষের প্রবেশদ্বারে পাহারা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।
হ্যান্ড জিওমেট্রি বায়োমেট্রিক্স (Hand Geometry)
মানুষের হাতের আকৃতি ও জ্যামিতিক গঠনে ভিন্নতা রয়েছে। যে বায়োমেট্রিক্স (Biometrics) পদ্ধতিতে মানুষের হাতের জ্যামিতিক আকার ও গঠন বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে শনাক্ত করা হয় তাকে হ্যান্ড জিওমেট্রি সিস্টেম বলে।
হ্যান্ড জিওমেট্রি বায়োমেট্রিক্সের সুবিধাঃ
১। বিশেষ
হার্ডওয়্যার ব্যবহৃত হয় বিধায় একে যে কোনো সিস্টেম বা ডিভাইসের সাথে সমন্বয় করা
সম্ভব।
২। ব্যক্তিকে
অদ্বিতীয়ভাবে শনাক্ত করতে এখানে যে ডেটাকে প্রসেস করা হয় তার পরিমাণ কম হওয়ায় এটি
সহজেই স্মার্টকার্ডে ব্যবহৃত হতে পারে।
৩। হ্যান্ড
জিওমেট্রির ব্যবহার অনেক সহজ।
হ্যান্ড জিওমেট্রি বায়োমেট্রিক্সের অসুবিধাঃ
১। ইনস্টলেশন খরচ বেশি।
২। ডিভাইসের
দাম তুলনামূলকভাবে বেশি
৩। বাত
আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য এই পদ্ধতি কার্যকর নয়।
৪। ফিংগার প্রিন্ট এর চেয়ে ফলাফলের সূক্ষ্মতা কম।
হ্যান্ড জিওমেট্রির ব্যবহারঃ
১। বিভিন্ন
পার্সোনাল আইডেন্টিফিকেশন কার্ড বা পার্সোনাল নম্বর জেনারেশনে যেখানে একাধিক
বায়োমেট্রিক সিস্টেম সমন্বিত হয় সেসব ক্ষেত্রে হ্যান্ড জিওমেট্রি সিস্টেম ব্যবহৃত
হয়ে থাকে।
২। বিভিন্ন
দেশের এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন সিস্টেমে অথেনটিকেশনে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
৩। বিভিন্ন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পরিচয়পত্রে।
আইরিস ও রেটিনা স্ক্যান (Iris & Retina Scan)
মানুষের চোখের অক্ষিগোলকের সামনের উপরে অবস্থিত রঙিন পর্দাকে আইরিশ বলে। আইরিশ অবস্থান করে চোখের মণির চারপাশে যা দেখতে অনেকটা আংটির মতো। চোখের চারপার্শ্বে বেষ্টিত এই রঙিন বলয় বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা করে ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে সনাক্তকরন পদ্ধতিকে আইরিস স্ক্যান বলে।
আর,রেটিনা হলো চোখের মণির পিছনে অবস্থিত একটি আস্তরণ স্তর । মানুষের চোখের পেছনের অক্ষিপটের মাপ ও রক্তের লেয়ারের পরিমাণ বিশ্লেষণ ও পরিমাপ করে কোন ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে সনাক্তকরন পদ্ধতিকে রেটিনা স্ক্যান বলে।
আইরিস ও রেটিনা স্ক্যান যেভাবে কাজ করেঃ
আইরিস স্ক্যান বায়োমেট্রিক্স (Biometrics) পদ্ধতিতে কোনো ব্যক্তিকে তার মাথা ও চোখকে স্থির অবস্থায় ক্যামেরা সংযুক্ত একটি ডিভাইসের সম্মুখে স্থাপন করতে হয়। উক্ত ক্যামেরাটি চোখের দুটো ফটোগ্রাফ গ্রহণ করে যার মধ্যে একটি সাধারণ আলোতেও অদৃশ্য আলো তথা ইনফ্রারেড আলোতে গ্রহণ করা হয়। সাধারণ আলোর ফটোগ্রাফটি চোখের তারার দৃশ্যমান রঙিন অংশকে পরীক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়।
.
অন্যদিকে ইনফ্রারেড আলোয় নেয়া ফটোগ্রাফটি চোখের তারার গাঢ় কালো অংশটি পরীক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়। এই দুই ফটোগ্রাফকে কম্পিউটারে নেয়ার পর এর অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো সরিয়ে ফেলা হয় এবং এখান থেকে প্রায় ২৪০টি অদ্বিতীয় বিন্দুকে শনাক্ত করা হয়। এগুলোকে একটি নিউমেরিক কোডে রূপান্তর করে তা আইরিস কোড হিসেবে এক্সট্যাক্ট করা হয়। অতঃপর পূর্বে সংরক্ষণ করা আইরিস কোডের সাথে তা ম্যাচিং করে কোনো অদ্বিতীয়ভাবে শনাক্ত করা হয়।
.
রেটিনা স্ক্যান পদ্ধতিটি এখন বাতিল প্রায়। এক্ষেত্রে চোখের মণির পশ্চাতে থাকা রেটিনাকে নির্দিষ্ট ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করে স্ক্যান করা হয়। মানুষের চোখের রেটিনাতে থাকা ক্যাপিলারি ও স্নায়ুবিক কোষগুলোর জটিল গঠনকে এক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন লেয়ারের ক্যাপিলারিতে থাকা রঙের পরিমাণও এক্ষেত্রে বিবেচিত হয়ে থাকে। এ দুই উপাদান থেকে অদ্বিতীয় অংশগুলো চিহ্নিত ও ম্যাচিং করে রেটিনা স্ক্যান অদ্বিতীয়ভাবে যে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারে।
আইরিস ও রেটিনা স্ক্যান বায়োমেট্রিক্সের সুবিধাঃ
১। অত্যন্ত হাই অ্যাকিউরিস পাওয়া সম্ভব।
২। এই
প্রত্যঙ্গগুলোকে সহজে নকল করা সম্ভব নয়।
৩। মৃত
ব্যক্তির রেটিনা দ্রুত পচন ধরে বিধায় একে বায়োমেট্রিক্স (Biometrics) পদ্ধতিতে
ব্যবহার করে অপরাধমূলক কাজ করা সম্ভব নয়।
৪। এটি মাত্র
৫ মিনিটেই ব্যক্তি শনাক্তকরণের কাজটি সম্পন্ন করতে পারে।
আইরিস ও রেটিনা স্ক্যান বায়োমেট্রিস্কের অসুবিধা
১। অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রযুক্তি।
২। প্রচুর
মেমোরি প্রয়োজন হয়।
৩। অনধিকার
প্রবেশমূলক প্রযুক্তি।
৪। চোখের জন্য কিছুটা ক্ষতিকর।
আইরিস ও রেটিনা স্ক্যান বায়োমেট্রিক্সের ব্যবহার
১। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরকারি সংস্থা যেমন- এফবিআই, নাসাতে
ব্যক্তি শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
২। সম্প্রতি
কারাগার, এটিএম
বুথ প্রভৃতিতে ভেরিফিকেশনে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
৩। মিলিটারিতে
এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
ডি.এন.এ (DNA) রিকগনিশন সিস্টেম বা ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টঃ
ডি.এন.এ এর পূর্ণরুপ হলো ডিওক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড যা কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত। প্রতিটি ব্যক্তির কোষস্থ ডিএনএ এর গঠন ও একক অদ্বিতীয়। মানুষের দেহের কোষে অবস্থিত ডিএনএ এর পার্থক্যের ভিত্তিতে ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে সনাক্ত করা যায়। “কোন মানুষের দেহের কোষের মধ্যে অবস্থিত ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি প্রোফাইল বা প্রতিকৃতি তৈরি করে উক্ত ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে সনাক্তকরন পদ্ধতিকে ডিএনএ প্রোফাইলিং বা ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট বলে।”
১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের Leicester বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী অ্যালেক জেফ্রিস ফরেনসিক গবেষণায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনলেন ডিএনএ প্রোফাইলিং আবিষ্কারের মাধ্যমে। ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় তিনি একটি পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের ডিএনএ এর এক্স-রে ফ্লিমের মধ্যে মিল খুঁজে পান, যা তার ডিএনএ প্রোফাইলিং পদ্ধতি আবিষ্কারের মূল ভিত্তি। বর্তমানে এই পদ্ধতি National DNA Database এ ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত National Forensic DNA Profiling Laboratory হলো বাংলাদেশের একমাত্র ডিএনএ টেস্ট করার প্রতিষ্ঠান।
ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট যেভাবে কাজ করেঃ
বিভিন্ন
মানুষের ডিএনএ প্রোফাইলে ৯৯.৯৯%
মিল থাকলেও এর ০.১% প্রত্যেক
মানুষের জন্য ইউনিক। ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টে এর ০.১% স্বতন্ত্রতাই ব্যক্তি শনাক্তকরণে
ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
ডিএনএ প্রোফাইলের মুখ্য উপাদান ডিএনএ প্রধানত কোনো অপরাধের স্থান (যেমন: খুনের স্থল, কোনো জায়গায়
পড়ে থাকা রক্ত ইত্যাদি),
মানবদেহের রক্ত,
চুল, শুক্ররস, পরিহিত জামা-কাপড় থেকে
সংগ্রহ করা যেতে পারে। অনেকদিন ধরে মাটির নিচে থাকা মানুষের মৃতদেহের কঙ্কাল থেকেও
ডিএনএ সংগ্রহ করা যেতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে শ্বেত কণিকার বা শুক্ররসে, চুলের গোড়ায়
অথবা অস্থিতে অবস্থিত কোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে ডিএনএ প্রোফাইল করা হয়। সংগৃহীত
ডিএনএ কে প্রধানত টেস্ট টিউবে সংগ্রহ করা হয় এবং একে সংরক্ষিত রাখার জন্য ঠান্ডা
বা কম উষ্ণতায় রাখা হয়।
ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টের সুবিধাঃ
১। পদ্ধতিগত ত্রুটি না থাকলে শনাক্তকরণে সফলতার
পরিমাণ শতভাগ।
২। মানবদেহের
যে কোনো প্রত্যঙ্গ বা জৈবিক উপাদান যা কোষ ধারণ করে সেখান থেকেই ডিএনএ স্যাম্পল
সংগ্রহ করা সম্ভব।
৩। প্রকৃত অপরাধীকে
সনাক্ত করতে সাহায্য করে।
ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টের অসুবিধাঃ
১। সহোদয় যমজদের ক্ষেত্রে ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট
সম্পূর্ণ এক হয়।
২। প্রোফাইলিং
করার সময় সংকরায়ন ও প্রোবিং পদ্ধতির ত্রুটি ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টের ত্রুটির
সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
৩।
পরীক্ষাগারের কর্মীদের কর্মদক্ষতা ও পারদর্শিতা এবং সতর্কতার অভাব ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টের
ফলের ওপর প্রভাব পড়ে।
ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যবহারঃ
১। অপরাধী শনাক্তকরণে ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহৃত
হয় ।
২। পিতৃত্ব ও
মাতৃত্ব নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
৩। বিকৃত
শবদেহ শনাক্তকরণে ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহৃত হয় ।
৪। চিকিৎসা
বিজ্ঞানে ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহৃত হয় ।
৫। মানুষের
বিবর্তনের সঠিক রাস্তা খোঁজা বা লুপ্তপ্রায় প্রাণীর বংশবৃদ্ধির জন্য জীনগত মিল রয়েছে
এমন আত্মীয় খুঁজে বের করতে।
আচরণগত বৈশিষ্ট্যের বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতিঃ
১। ভয়েস রিকগনিশন সিস্টেম (Voice Recognition System): প্রত্যেকের
কণ্ঠের ধ্বনির বৈশিষ্ট্য,
সুরের উচ্চতা, সুরের
মূর্ছনা, স্পন্দনের
দ্রুততা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা।
২। সিগনেচার
ভেরিফিকেশন সিস্টেম (Signature
Verification System): হাতের দস্তখত বিশ্লেষণ করা।
৩। টাইপিং
কীস্ট্রোক রিকগনিশন
সিস্টেম (Typing
Keystroke Recognition System): নির্দিষ্ট কোনো পাসওয়ার্ড যা টাইপ
করে এন্ট্রি করা হয় এবং বিশ্লেষণ করা।
ভয়েস রিকগনিশন সিস্টেম (Voice Recognition System):
কন্ঠস্বরকে ডেটায় রূপান্তর করে কম্পিউটারের ডেটাবেজে সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে ভয়েস ইনপুট নিয়ে আগের সংরক্ষিত ভয়েসের সাথে মিলিয়ে দেখে শনাক্তকরণ পদ্ধতি হলো ভয়েস রিকগনিশন সিস্টেম।
ভয়েস রিকগনিশন (Voice Recognition) বায়োমেট্রিক্সের সুবিধা:
১। মাত্র ৫ মিনিটে রিকগনিশন সম্ভব।
২। সস্তা প্রযুক্তি।
৩। উচ্চমানের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।
ভয়েস রিকগনিশন (Voice Recognition) বায়োমেট্রিক্সের অসুবিধা:
১। অ্যাকিউরিসি এর পরিমাণ নিম্ন।
২। অনেক সময়
ভয়েস নকল করা সম্ভব।
৩। অসুস্থতার
জন্য গলা বসে গেলে এটি ঠিকমতো কাজ করবে না।
ভয়েস রিকগনিশন (Voice Recognition) বায়োমেট্রিক্সের ব্যবহার:
১। বড় বড় প্রতিষ্ঠান সময় ও উপস্থিতি
নিয়ন্ত্রনে ব্যবহার করে থাকে।
২। অনেক আর্থিক
প্রতিষ্ঠান টেলিফোনের মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে Voice
Recognition সিস্টেম ব্যবহার করে থাকে।
৩। অনেক
প্রতিষ্ঠান তাদের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার
করে।
সিগনেচার ভেরিফিকেশন সিস্টেম (Signature Verification System):
এ পদ্ধতিতে ব্যবহারকারীর হাতের স্বাক্ষরকে পরীক্ষা করে সত্যতা যাচাই করা হয়। এক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের কলম এবং প্যাড ব্যবহার করে স্বাক্ষরের আকার, লেখার গতি, সময় এবং কলমের চাপকে পরীক্ষা করা হয়। অন্যান্য বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতির চেয়ে খরচ কম।
সিগনেচার ভেরিফিকেশন এর সুবিধাঃ
১। মাত্র ৫ মিনিটে রিকগনিশন সম্ভব।
২। সস্তা
প্রযুক্তি।
৩। ইহা একটি
সর্বস্থরের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
সিগনেচার ভেরিফিকেশনে বায়োমেট্রিক্সের অসুবিধাঃ
১। সঠিকভাবে শনাক্তকরণের ব্যাপারটি একটু কঠিন।
২। সিগনেচার
প্যাটার্ন না মিললে কাজ করবে না।
৩। যারা
স্বাক্ষর জানে না তাদের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় না।
সিগনেচার ভেরিফিকেশনে বায়োমেট্রিক্সের ব্যবহারঃ
স্কুল, কলেজ, ব্যাংক-বীমা, সরকারী অফিস-আদালতে ব্যক্তি সনাক্তকরনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
টাইপিং কীস্ট্রোক রিকগনিশন সিস্টেমঃ
যখন কোন ব্যক্তি কম্পিউটার কী-বোর্ডে কাজ করে, তখন প্রত্যেক কী-তে চাপ দিয়ে ছেড়ে দিলে তা সঠিক বিবরণ দেয়। এতে নির্দিষ্ট কোন পাসওয়ার্ড যা টাইপ করে এন্ট্রি করা হয় এবং বিশ্লেষণ করা হয়। এ পদ্ধতে ব্যবহারকারীর টাইপিং ধরণ ও কী-বোর্ডের গতি বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিকে অদ্বিতীয়ভাবে সনাক্ত করা হয়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন